এখন পড়ছেন
খবর

রিমান্ড মওসুম

54733_jaকাফি কামাল/ মানব জমিন: বৈচিত্র্যময় আতঙ্ক রাজনীতিতে। নানা সময়ে নানা চরিত্রে বিরাজ করে রাজনৈতিক আতঙ্কের মওসুম। সবসময়ই ছিল, এখনও। কখনো মামলা আতঙ্ক, কখনো গ্রেপ্তার। কখনো খুন কখনো বা গুম আতঙ্ক। এক সময় ছিল ডিটেনশন। পরাধীন দেশে রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করেই দেয়া হত ডিটেনশন। ওয়ান ইলেভেনের সময় সেটা ছিল জরুরি সরকারের দারুণ অস্ত্র। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে আতঙ্কের মওসুম এসেছে নানা নামে, নানা রূপে। খুনের মওসুমে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক নেতাকর্মী। তারপর চলেছে গুমের মওসুম। হারিয়ে গেছেন অনেকেই। হদিস মেলেনি। যখন মামলার মওসুম শুরু হলো- নেতাকর্মীদের নামে দায়ের হলো হাজার হাজার মামলা। এক একজন নেতার বিরুদ্ধে ১০-১২০টি পর্যন্ত। মামলা দায়েরের রেকর্ড গড়লো একেরপর এক। মানুষের বিস্ময় তখন চরমে। এক মামলায় ১০ হাজার থেকে ২১ হাজার পর্যন্ত আসামী। কোথাও পুরো গ্রাম, কোথাও পুরো জনপদ। বাছবিচারহীন অভিযুক্ত। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে এসব রেকর্ড স্থান পায় কিনা!

দেশের রাজনীতিতে এখন চলছে রিমান্ড আতঙ্কের মওসুম। সন্দেহভাজন, অভিযুক্ত, পেশাদার অপরাধী আর রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কোন তফাৎ থাকছে না। অপরাধের মাত্রাও বিবেচ্য কিনা প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে। এখন গ্রেপ্তার মানেই রিমান্ড অনিবার্য। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ যে মেয়াদে রিমান্ড চান তা দেখে বিচারকদের মনে ভাবনার জন্ম হয় কিনা তা অজানা। তবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন গ্রেপ্তারকৃতরা। অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায় তার পরিবার পরিজনের। গ্রেপ্তারকৃতদের আসামী দেখানো হয় একাধিক মামলায়। এক একটি মামলায় রিমান্ড চাওয়া হয় ৭-১০দিন। তিনদিন তো ন্যূনতম। বেশিরভাগের বরাদ্দ ৮-১০দিন। কারো কারো রিমান্ডের মেয়াদ শুনলে আতকে ওঠে মানুষ। ১৫-২২দিন! আবার দফায় দফায়। গ্রেপ্তারের পর অনেকের রিমান্ডেই কেটে যায় টানা মাস দুয়েক! বাংলাদেশের ইতিহাসে অবশ্যই রিমান্ড রেকর্ড গড়েছেন জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান। ভোগ করেছেন অন্তত দেড়শ দিনের রিমান্ড। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ রিমান্ড চান নানা কারণে। কখনো সত্যিকার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য, কখনো বা সরকারের নির্দেশনায়। এসব অভিযোগ রাজনীতিবিদরা করেন, করেন অভিযুক্ত এবং তাদের আইনজীবীরাও। কিন্তু যারা মঞ্জুর করেন। তারা কি আসলে অপরাধের ধরন দেখে তা মঞ্জুর করেন? এমন প্রশ্ন এবং বিস্ময় দেশের মানুষের।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে-বিদেশে আলোচনার তুঙ্গে হেফাজতে ইসলাম। ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দেয়ার প্রতিবাদে নেমেছিল রাস্তায়। কোন সাংগঠনিক কাঠামো নেই তবুও তারা রাজধানীতে উপস্থিত করলো লক্ষ লক্ষ মানুষ। সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি ছিল তাদের। যদিও তাদের সেসব দাবির সঙ্গে একমত নয় দেশের প্রধান কোন রাজনৈতিক দলই। কিন্তু কেবল ধর্মবিশ্বাসের জায়গা থেকেই তাদের সমর্থন দিয়েছিল বিরোধীদল। এমনকি সরকারী জোটের প্রধান শরিকও। কিন্তু তাদের নিয়ে সরকারের ভূমিকাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। হেফাজত অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছিল, পরে অবস্থান কর্মসূচিতে যায়। সরকার তাদের অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিল কিন্তু রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের সরিয়েও দেয়। সে অভিযান ও সেখানে হতাহতের ঘটনা নিয়ে এখন পাল্টাপাল্টি সর্বত্র। যাহোক, হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নৈরাজ্যের ঘটনায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে দায়ের করা হলো অন্তত ৩০টি মামলা। মামলার প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার করা হলো হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে। গ্রেপ্তারের পরই একটি হত্যা মামলায় তাকে ৯দিনের রিমাণ্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে আদালতে উপস্থাপন করে তিন মামলায় ২৬দিন রিমান্ড আবেদন করে। ১৬ই মে ফের ২২দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় বাবুনগরীকে। দ্বিতীয় দফায় ২৬দিনের আবেদনে ২২দিনই মঞ্জুর করেন আদালত! ২০১২ সালে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী। তার সন্ধান দাবিতে আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনই ১৮দলীয় জোট নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের হয় কয়েকটি মামলা। সে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান রতনকে। দেশ টিভিতে রাতে টকশো-তে অংশ নিয়ে তিনি কেবল নিচে নেমেছেন। কিন্তু পুলিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করে তাকে রাত সাড়ে আটটায় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে গাড়ি পোড়ানোর সময়। কিন্তু আদালত সব জেনেও রিমান্ড মঞ্জুর করলেন ৩দিনের। সে রিমান্ড শেষ না হতেই আরেক মামলায় ফের ৩দিনের! এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সময়টা তখন ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করা হলো নির্বিচারে। গ্রেপ্তারের পর একদিন একই সময়ে একই আদালতে হাজির করা হয়েছিল তিনজনকে। কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপির এমপি শিল্পপতি আবুল হাসেম। পুলিশ প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৭দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন আদালতে। শুরু হলো বাবরকে দিয়ে। বাবরের পক্ষে কোন আইনজীবী না লড়লেও তাকে ৪দিনের রিমান্ড দেন আদালত। হাশেমের পক্ষে লড়েছিলেন বিএনপির আইনজীবীরা। আদালত তাকেও দেন ৪দিনের রিমান্ড। ততক্ষণে অসুস্থ আবদুল জলিল আদালতের অনুমতি নিয়েই দুইবার বাথরুমে যান। শেষে আবদুল জলিলের জন্য দুইঘন্টার বেশি আইনী লড়াই চালান বর্তমান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী। লম্বা শুনানীর পর আদালত তাকেও দিয়েছিলেন ৪দিনের রিমান্ড! কোন নেতাকে রিমান্ডে নেয়া হলে আমার সে ঘটনা মনে পড়ে। কিন্তু মানুষের প্রশ্ন এত লম্বা সময় কি হয় রিমান্ডে? রাজনীতিবিদরা প্রকাশ করেন মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারো অভিজ্ঞতা মর্মন্তুদ, কারো অপমানের। কিন্তু এতদিন কেন? আমাদের দেশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা কি এতই অনভিজ্ঞ যে একজনের কাছ থেকে তথ্য আদায় করতে ২২দিন সময় লাগবে! একজন মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহারে এক ঘণ্টায় তার পুরো জীবনচিত্র জানা যায়। দুর্ব্যবহারে কি সময় বেশি লাগে? কি আদায় হয় রিমান্ডে? যেখানে পরবর্তী সময়ে আদালতে সমস্ত স্বীকারোক্তি অস্বীকার করেন অভিযুক্ত। মানুষের কেবল বিস্ময়ই বাড়ে। অথচ হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে কাউকে টানা তিনদিনের বেশি রিমান্ডে নেয়া যাবে না।

প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান একজন ব্যবসায়ী ও একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন। তার ধারালো লেখনির প্রশংসা করেন খোদ তার মতের সঙ্গে বিরোধীতাকারীও। চলতি বছরের ১১ই এপ্রিল দৈনিক আমার দেশ কার্যালয় থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহীতা ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপরাধ। তিনটি মামলায় ২৪দিনের রিমান্ড আবেদনে প্রথমদফায় মঞ্জুর হয় ১৩দিন। রিমান্ডে অনশন করে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এখনও তার রিমান্ড বাকি। ২০১০ সালেও তাকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেবারও লম্বা সময় রিমান্ডসহ ৯ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান তিনি। ৩১শে মার্চ রাজধানীর শ্যামলীর এক আতœীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি দেলোয়ার হোসেনসহ তিনজনকে। দুই মামলায় প্রথমদফায় ১৪দিন রিমান্ডে নেয়া হয় দেলোয়ারকে। ৫ মামলায় ফের ১৮দিন। এরপর আরও কয়েকদফায় ১৪দিন। গ্রেপ্তারের পর থেকেই পুলিশ হেফাজতে রয়েছে দেলোয়ার। সারা দেশে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১২০টির বেশি। রিমান্ড চলতে থাকলে তিনি নিশ্চয়ই ছাড়িয়ে যাবেন মুফতি হান্নানকে। রিমান্ড নিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেছে ২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ। ১১ই মার্চ বিএনপি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। সেদিন কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৫৪জন নেতাকর্মীকে। ১৩ই মার্চ কয়েকজন সাবেক এমপিসহ ১৫১জন নেতাকর্মীকে দুই মামলায় ১৭দিন করে রিমান্ড চাইলে আদালত ৮দিন মঞ্জুর করে। এত বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে একত্রে রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সম্ভবত বিশ্ব ইতিহাসেও বিরল। কিন্তু মানুষের প্রশ্ন এত লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন কতজন কর্মকর্তা। একই ঘটনায় এত মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদেরই বা কি আছে। সবচেয়ে বড় কথা তাদের কোথায় রেখে চলবে এ জিজ্ঞাসাবাদ। যাদের অনেকের শরীরে আবার ডান্ডাবেড়ি। দেশবাসী দেখল এক করুন চিত্র। পল্টন থানার কয়েকটি কক্ষে ইলিশের মতো গাদাগাদি করে দমবন্ধ রিমান্ডকাল কাটালেন শতাধিক নেতাকর্মী। সে সময় আশপাশের দোকানদাররাও যেন হয়ে উঠেছিলেন প্রতিহিংসাপরায়ন। রিমান্ডে থাকা নেতাকর্মীদের পরিবারের কাছে পল্টন থানার সামনের দোকানদাররা ৩০টাকা দামের এক বোতল পানির দাম রাখলেন ১০০ টাকা!

এখন চলছে রীতিমতো রিমান্ড মওসুম। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে কারাগারে পাঠানোর পর মুখপাত্রের দায়িত্ব পেয়েছিলেন যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ। কিন্তু ৮ই এপ্রিল রাতে গুলশান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ ১০দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৩দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। উচ্চ আদালতের জামিন পেয়ে ৮ই মে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। কিন্তু জেল গেটেই তাকে গ্রেপ্তার করে এক মামলায় ৪ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। অন্যদিকে সাভারে ভবন ধ্বসের ঘটনায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছে এক মর্মান্তিক ট্রাজেডি। এতে ১ হাজার ১২৭ ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা। তার অপরাধের মাত্রা কেমন তা বুঝতে বাকি থাকে না কারোর। এমন মর্মান্তিক ঘটনায় তার পক্ষে আইনী লড়াই না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের আইনজীবী সমাজ। গ্রেপ্তারের পর দুই মামলায় তাকে ১০দিন করে ২০দিন রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত ১৫ দিনের রিমান্ড দেয়। ১৩দিনের মাথায় ফের ১৩দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। অন্যদিকে রানার বাবা খালেককে ১৩দিনের রিমান্ড শেষে ফের ৪ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আবার যাদের কারণে হেফাজতের সৃষ্টি, সে ব্লগারদের কি অবস্থা। নানামুখী সমালোচনার মুখে সরকার গ্রেপ্তার করে চার ব্লগারকে। তারাও প্রত্যেকেই ভোগ করেন তিনদিনের রিমান্ড। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে নানা প্রশ্ন। কে বেশি অপরাধী? যার লোভের কারণে প্রাণ হারালো ১১২৭জন মানবসন্তান সে সোহেল রানা। যাদের উস্কানীর কারণে হেফাজত দেশের রাজনীতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করলো সে কতিপয় ব্লগার। নাকি ধর্মবিশ্বাসের কারণে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেয়া একজন বয়স্ক আলেম। আপাতত মাওলানা বাবুনগরীই এগিয়ে আছেন।

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers