এখন পড়ছেন
কলাম

শাপলা চত্বর অভিযানের ওপর নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে- বদরুদ্দীন উমর

imagesকোন ব্যক্তিই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোন ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা পালন করতে পারে না। সবার উৎপত্তিই সমাজের গর্ভে এবং তাদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা সব কিছুই সমাজের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এটা আবার সম্পূর্ণ যান্ত্রিকভাবে হয় না। কাজেই সমাজে ব্যক্তিরও ভূমিকা থাকে। সেই হিসেবে ইতিহাসেও ব্যক্তির ভূমিকা এক বাস্তব সত্য। শুরুতেই এসব কথা বলার প্রয়োজন হল এ কারণে যে, বাংলাদেশে এখন সাধারণভাবে যে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম ও রাজনীতি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এটা ৪২ বছর ধরে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও তাদের একের পর এক সরকার যে লুণ্ঠন, চুরি, দুর্নীতি ইত্যাদি করে এসেছে তার ফলে ঘটলেও বিগত দুই দশক ধরে রাজনীতি ক্ষেত্রে যে নৈরাজ্যিক এবং নৈতিকতাবিহীন অবস্থা দেখা যাচ্ছে, এটা অনেকাংশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রীর ক্ষমতার লোভ, দুর্নীতি ও পারস্পরিক ব্যক্তিগত শত্র“তার কারণেই ঘটছে। এ ক্ষেত্রে যে এই দুই ভদ্রমহিলার একটা কার্যকর ভূমিকা আছে এ নিয়ে এদেশের জনগণের কোন সংশয় নেই। শুধু তা-ই নয়, তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের মানুষ এখন অতিষ্ঠ। কোন বিকল্পের অভাবে তারা নির্বাচনের সময় এদেরকে ভোট দিলেও এদের কাউকেই তারা দেশ পরিচালনার যোগ্য মনে করেন না এবং এদের হাত থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে এই চিন্তা তাদের এখন অস্থির রেখেছে।

এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে, বর্তমানে বাংলাদেশে যে অরাজক পরিস্থিতি রাজনীতি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এ দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একে বিশেষভাবে বিষাক্ত ও বিপজ্জনক করেছে। এদের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এমনভাবে রাজনীতিকে প্রভাবিত ও কলুষিত করছে, যাতে পরিস্থিতির মধ্যে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। অনিশ্চয়তার থেকে বড় হুমকি জনগণের জন্য কিছুই হতে পারে না। কাজেই ভবিষ্যতের গর্ভে কী আছে, এটাই এখন জনগণের ব্যাপকতম অংশের জিজ্ঞাসা। এটা খুব স্পষ্ট যে, আগামী নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবেÑ বিদ্যমান সরকারের কর্তৃত্বে, না একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি। এই দ্বন্দ্ব মূলত দেখা দিয়েছে এ অবস্থার কারণে যে, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের চরিত্র এমন যাতে তাদের কোন একজনের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন পরিচালিত হলে তিনি কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভের জন্য সব রকম শক্তির ব্যবহার অবশ্যই করবেন। শুধু এ দুই নেত্রীই নন, সাধারণভাবে জনগণেরও বিশ্বাস তাই। এ পরিস্থিতি যে শুধু ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর সৃষ্টি হয়েছে, তা নয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও এ অবস্থা থাকায় ১৯৯১ সালের নির্বাচনও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই করতে হয়েছিল। পরে এ অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকে বিধিসম্মত করা হয়।

চরম ক্ষমতালোভী স্থূল স্বভাবের এই নেতৃত্বের অধীনে এদেশে কোন নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে নির্বাচন পরিচালনার মতো অবস্থা না থাকায় এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সরকার গঠন করে তার অধীনে নির্বাচন করার মতো অবস্থা এখন পর্যন্ত না থাকার জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন শেষ হয়নি। আওয়ামী সরকারের লোকজন ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবী ছাড়া এ মুহূর্তে এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহাগণতন্ত্রী হিসেবে বারবার বলছেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে তারা কোন অনির্বাচিত সরকারকে নির্বাচন পরিচালনা করতে দিতে পারেন না। কিন্তু এখন তারা এ কথা বললেও ১৯৯৬ সালে তারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিলেন। তাদের চাপের মুখেই তৎকালীন বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস করে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিল। এদিক দিয়ে বিচার করলে গণতন্ত্রের পূজারি হিসেবে শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কোন কারণ নেই এবং বস্তুত সে রকম কোন শ্রদ্ধাও তাদের নেই। এ প্রসঙ্গে এ মুহূর্তে যা প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা দরকার তা হল, শেখ হাসিনা যখন গণতন্ত্রী হিসেবে এসব কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে বলছেন, ঠিক তখনই তারা জাতীয় সংসদের এমন এক স্পিকার নির্বাচন করেছেন যিনি নির্বাচিত নন! তিনি একজন নারী। এ নিয়ে হাসিনা অনেক গর্বিত কথাবার্তা বললেও এটা যে তার শুভঙ্করের এক মস্ত ফাঁকি এতে আর সন্দেহ কী? কারণ কোন অনির্বাচিত ব্যক্তি নারী বা পুরুষ যা-ই হোক, তার ওপর একটি নির্বাচিত জাতীয় সংসদ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ কোন গণতন্ত্রীর কাজ নয়। এসব থেকে দেখা যায়, এ ধরনের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যখন যেমন সুবিধা সেভাবেই কাজ করেন এবং তাদের এ ধরনের কাজের মাধ্যমে জনগণকে প্রতারিত করেন। এ কারণে তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য থাকে না। তাদের রাজনীতিতে সুবিধাবাদই সার্বভৌম। বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ যে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছে, এটা তাদের সার্বভৌম সুবিধাবাদেরই এক অভিনব বা উদ্ভট রূপ।

বাংলাদেশে কোন স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নেই। তাই নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার জন্য প্রয়োজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। কাজেই বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যেই হোক, এ ধরনের সরকারের বিরোধিতার মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক বিবেচনা বলে কিছু নেই। কেউ যদি নিশ্চিত হয়, জনগণ ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করবে তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে তার ভয় করার কিছু নেই। কিন্তু সত্য ব্যাপার হল, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারই এখন আওয়ামী লীগকে ভূতের মতো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। শেখ হাসিনা যদি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হতেন যে, নিরপেক্ষ কোন নির্বাচন কমিশন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে, তাহলে যেভাবে নির্বাচনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে তিনি পরবর্তী জাতীয় সংসদ গঠনের চেষ্টায় খুনখারাবি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন, এটা তিনি করতেন না। এ বিষয়টি তিনি জানেন, তার দল ও জোটের নেতা-নেত্রীরা জানেন এবং জনগণকে তারা বোকা মনে করা সত্ত্বেও জনগণও এটা ভালোভাবেই জানেন। বিএনপি কোন সাধু-সন্তদের দল নয়। চরিত্রগতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের কোন মৌলিক তো নয়ই, উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিগত প্রায় পাঁচ বছরের শাসন আমলে তাদের লুটতরাজ, চুরি, দুর্নীতি, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হামলা এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছে, যাতে জনগণ আওয়ামী লীগকে পরবর্তী নির্বাচনে আর ক্ষমতায় বসাতে চান না। অন্য কোন বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা না থাকায় তারা আপাতত চান সরকারের পরিবর্তন। নির্বাচনে জনগণের এই চিন্তা ও মতামতের স্বাধীন প্রকাশের জন্যই প্রয়োজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে এখানে এত কথা বলার প্রয়োজন হল এ জন্য যে, এ বিষয়টিই বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নৈরাজ্য এবং অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ। এ পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা যদি না হয় তাহলে এই অস্থিরতা, এই নৈরাজ্য, এই অনিশ্চয়তার অবসান সম্ভব নয়। কিন্তু এ অবস্থা তো অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। কাজেই গণতন্ত্রের পূজারি শেখ হাসিনার দ্বারা যদি এ সংকট নিরসনের কোন ব্যবস্থা না হয়, তাহলে পরিণামে তিনি নতুন এক ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকারকেই ডেকে আনবেন। নিজের নাক কেটে তিনি অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করবেন!

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী এখন আওয়ামী লীগ ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতি কর্মীদের উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ এবং চরম পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় চিন্তাধারার থেকে সৃষ্ট এক ধরনের বর্বরতার সংঘর্ষকেই তাদের মূল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছে। ১৯৭২ সাল থেকে ক্রমাগতভাবে তীব্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রচার করে এবং দেশে লুটপাট ও চুরি-দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করে, জনগণের জীবন ও জীবিকার ওপর হামলা করে, ব্যাপকভাবে সমাজে তারা যে হতাশা সৃষ্টি করেছে তার মধ্যেই বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির পুনর্জš§ হয়েছে। এদিক দিয়ে বলা যেতে পারে, জামায়াতে ইসলামী থেকে নিয়ে হেফাজতে ইসলাম পর্যন্ত প্রত্যেকটি ধর্মীয় সংগঠনই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর গণবিরোধী কার্যকলাপেরই রাজনৈতিক পরিণতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলের কার্যকর অনুপস্থিতি। এ শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় দলগুলো মানুষের ইহলোকের কর্মসূচিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরলোকের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা কর্মসূচির এই হল ঐতিহাসিক পটভূমি। এখানে লক্ষণীয় যে, হেফাজতে ইসলাম এই কর্মসূচির মাধ্যমে যেভাবে এখন নাস্তিকবিরোধী জেহাদ ঘোষণা করেছে, এটা কোন সভ্য সমাজের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। এরাই কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলে যে, ইসলামে ধর্মীয় জবরদস্তির কোন স্থান নেই। আবার এরাই বলে, সব ধরনের বিধর্মী ও নাস্তিককে শাস্তি দিতে হবে। এমনকি নাস্তিকদের ফাঁসি দিতে হবে! হেফাজতে ইসলামের এই বর্বর দাবিই প্রমাণ করে, ধর্মের রাজনীতি বাংলাদেশে আজ কত নিকৃষ্ট ও ফ্যাসিস্ট চরিত্র পরিগ্রহ করেছে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, এই বর্বরতার সঙ্গে সমঝোতা ও কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য শাসকশ্রেণীর দুই প্রধান দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই সচেষ্ট। বিএনপি হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়েছে এবং আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে এ নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগ ১৩ দফার মধ্যে কতগুলো দফা ইতিমধ্যেই কার্যকর করছে এ কথা বলে তার একটি ফিরিস্তিও প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। অন্যগুলোর জন্য কী আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন এ নিয়েও তারা হেফাজতওয়ালাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। তাদের আশ্বাস দিয়েছেন! এ কথা হেফাজতে নেতা শফী আহমদ তার বগুড়া বক্তৃতায় প্রকাশ্যেই বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হয়নি। বিশেষ করে বিএনপি হেফাজতের শক্ত মিত্র হিসেবে দাঁড়ানোর পর তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দল হেফাজতে ইসলাম তার প্রতি জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, বিএনপি ইত্যাদির সমর্থন দেখে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে মাঠে নেমেছে। এ জন্য তারা ৬ এপ্রিল ঢাকায় এক মহাসমাবেশ করেছে। তারপর ৫ মে তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী তারা ঢাকা অবরোধ করেছে। এই অবরোধের একপর্যায়ে সরকার তাদের ঢাকায় প্রবেশ করার সুযোগ এবং শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। ৫ তারিখে শাপলা চত্বরে হেফাজতের বিশাল সমাবেশ চলাকালে তাদের লোকজন পুরানা পল্টন, বায়তুল মোকাররম ও বিজয়নগর এলাকায় ব্যাপক আকারে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি করে। শত শত ফুটপাতের দোকান অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়। শত শত গরিব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পথে বসেন। এই তাণ্ডবে যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির এবং সেই সঙ্গে অন্য দলের লোকজন অংশগ্রহণ করে এতে সন্দেহ নেই। হেফাজতের সমাবেশে বিপুল জনসমাগমের সুযোগ নিয়ে এ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। হঠাৎ করে কেন হেফাজতের লোকদের ঢাকা শহরে ঢুকতে দেয়া হল, কেন তাদের শাপলা চত্বরে অনির্ধারিত সমাবেশ করতে দেয়া হল, কেন পল্টন ও বায়তুল মোকাররমে তাণ্ডব করার সময় তাদের বিরত রাখার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ না নিয়ে ঢিলেঢালাভাবে তা সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হল, কেনইবা মধ্যরাতের অন্ধকারে শাপলা চত্বরে হাজার হাজার হেফাজত কর্মীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের হতাহত ও ছত্রভঙ্গ করা হল, এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এর জবাব সরকারকে অবশ্যই দিতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ৫ মে রোববার পল্টন এলাকায় হেফাজতের তাণ্ডবের ওপর ৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস নোটে বলা হলেও ৫ তারিখ রাতে শাপলা চত্বরে সরকারের অভিযান বিষয়ে সেই সরকারি প্রেস নোটে কোন উল্লেখ নেই! অথচ শাপলা চত্বরে হেফাজতের লোকদের ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে ছত্রভঙ্গ করা যে বাঁশি বাজিয়ে ও সঙ্গীত গেয়ে হয়নি, এটা মতলববাজ ছাড়া কোন বোধবুদ্ধিসম্পন্ন লোক অস্বীকার করতে পারে? কেউ যদি এ কথা বলে যে, পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় হেফাজতের তাণ্ডব বন্ধ করার পরিবর্তে তা বেশ কয়েক ঘণ্টা চলতে দেয়া শাপলা চত্বরে হেফাজতওয়ালাদের আক্রমণের অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশে করা হয়েছে, তাহলে সেটা কি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক হবে?

৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য কোন গুলিই চালানো হয়নি, এমন দাবি সরকার থেকে করা হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমগুলোও এ নিয়ে তেমন কিছু বলছে না। তারা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। কিন্তু চোঙা ফুঁকে ও টিয়ার গ্যাস দিয়ে যে ১৫/২০ মিনিটে শাপলা চত্বরে জড়ো হওয়া ৩০ থেকে ৫০ হাজার লোক সরানো যায় না, এটা সহজবোধ্য। গুলি অবশ্যই হয়েছে। কারণ জনগণের ওপর গুলি চালাতে সরকারের কোন দ্বিধা এখন দেখা যাচ্ছে না। ৬ মে তারিখে কাঁচপুরে গুলি চালিয়ে তারা ২০ জনকে হত্যা করেছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে রাস্তা অবরোধ পরিষ্কার করার জন্য তারা ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে ওই দিনই। কেন এই হত্যা? রাস্তা দুই-একদিন বা চারদিন অবরোধ করে রাখলে কী হয়? তার জন্য কি মানুষ মারতে হবে? তাছাড়া রাস্তা অবরোধ করলে তার মোকাবেলা যে সহজভাবে করা যায়, শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের অবরোধই তো তার দৃষ্টান্ত।

এর পূর্বে ২৮/২৯ ফেব্র“য়ারি তারা উত্তরবঙ্গের রাজশাহী অঞ্চলে একশ’রও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। প্রত্যেক সংবাদপত্রে তার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে ফেব্র“য়ারি থেকে এ পর্যন্ত সরকার দু’শর বেশি লোককে গুলি করে হত্যা করেছে। এ কাজ করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে কিছুসংখ্যক পুলিশও নিহত হয়েছে। কাজেই ৫ মে রাতে সরকারের শাপলা চত্বর অভিযান যে নিরামিষ ব্যাপার ছিল এটা মনে করার কারণ নেই। আসলে সরকারের কোন প্রেস নোট না থাকায় এবং সত্য খবর না জানানোর ফলে যেভাবে গুজব ছড়ায় সেভাবেই গুজব ছড়াচ্ছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে অনেকে অনেক রকম বলছে। বিরোধী দল বিএনপি আড়াই-তিন হাজার নিহতের যে কথা বলছে এটার কোন ভিত্তি নেই, যেমন কাউকেই গুলি করে হত্যা করা হয়নি আওয়ামী লীগের এই বক্তব্যেরও কোন ভিত্তি নেই। এরপরও আওয়ামী লীগ দল ও সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য হতাহত সম্পর্কে যার যা ইচ্ছা বলার মতো শর্ত তৈরি করেছে। মৃতের সংখ্যা নিয়ে সরকার যেসব বক্তব্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে দিচ্ছে তার মধ্যে সত্যতা বলে যে কিছু নেই, সাভারের নিহত গার্মেন্ট শ্রমিকের সংখ্যা সম্পর্কে তাদের বক্তব্যের মধ্যেও এটা দেখা যায়। মাত্র কয়েক দিন আগেই, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে, মেজর জেনারেল সারওয়ার্দী প্রেসের সামনে বললেন, মৃতের সংখ্যা যা বলা হচ্ছে তার থেকে অনেক কম। তাদের কাছে মাত্র ১৪৯ জন নিখোঁজের হিসাব আছে। অথচ তারপর থেকে এ কয়দিনে ছয়শ’রও বেশি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ অবস্থায় উপরোক্ত হিসাবের বিশ্বাসযোগ্যতা কী দাঁড়ায়? সরকার যে মৃতের সংখ্যা নিয়ে কী ধরনের মিথ্যা হিসাব দিচ্ছে এ হল তারই দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এখন যে হারে গুলি চালিয়ে মানুষ খুন করছে, এটা আগে দেখা যায়নি। শেখ মুজিবের সময় রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে হাজার হাজার বামপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু রাস্তায় এভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়নি। এটা এখন শুরু হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে যদি রুখে দাঁড়ানো না যায় তাহলে এটা চলতে থাকবে। কিন্তু এটা চলতে দেয়া যায় না। শাপলা চত্বরে যত লোক হত্যা করা হয়েছে এবং ওই রাতে ঠিক কী হয়েছে তার ওপর কোন সরকারি প্রেস নোট না থাকায় সরকার ও আওয়ামী লীগের কিছু বাচাল মুখপাত্রের কথার বেশি আর কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু জনগণকে এ বিষয়ে জানতে হবে এবং তার জন্য শাপলা চত্বরে সাঁড়াশি অভিযানের সময় ঠিক কী ঘটেছিল তার ওপর একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিশন সরকারকে অবিলম্বে গঠন করতে হবে। এ কাজ না করলে ক্ষমতার মসনদে বসে ইচ্ছামতো জনগণের ওপর হামলা এবং ইচ্ছামতো সে বিষয়ে বক্তব্য প্রদান বন্ধ হবে না। এবং এটা বন্ধ না হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতিই যে শুধু সংকটজনক হবে তা-ই নয়, জনগণের জীবনের সংকটও সব মাত্রা অতিক্রম করবে।

১০.৫.২০১৩

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers