এখন পড়ছেন
খবর, বিবৃতি

আলেম সমাজ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার

hiমহিউদ্দীন জুয়েল, চট্টগ্রাম/ মানব জমিন: চট্টগ্রামে আজ বুধ ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১৮ দলীয় জোটের হরতালে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আগামী ১২ই মে রোববার হেফাজতের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী পূর্ণ দিবস হরতালেরও ডাক দিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল বিকালে হাটহাজারী মাদরাসায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব কথা জানান দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।  সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নিরীহ আলেম, মাদরাসা ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর বর্বরোচিত হামলা ও  হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, সহিংসতা ও কোরআন পোড়ানোর সঙ্গে হেফাজতকে জড়িয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী। এতে বলা হয়, বর্তমানে এদেশের আলেম সমাজ ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার। এমন নিষ্ঠুরতম পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ইতিপূর্বে আর ঘটেছে বলে কারও জানা নেই।

এমন এক সময় এই কথা বলা হচ্ছে, যখন এদেশের নিরীহ আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্তের দাগ রাজপথে লেগে আছে। লাশ পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে। অজানা স্থানে। মহান আল্লাহ ও তার রাসুলের ভালবাসার টানে ঘর থেকে বের হওয়া হাজার হাজার নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ এখনও ঘরে ফিরেনি। তারা কোথায় কি অবস্থায় আছেন, জীবিত আছেন কিনা কেউ কিছুই জানে না। এক চরম বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেশ অতিক্রম করছে। এমন ভয়াবহ চিত্র যুদ্ধাবস্থাকেও হার মানিয়েছে।

ঢাকার ঘটনা প্রসঙ্গে বলা হয়, রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় ৫ই মে দিবাগত রাতে ঘুমন্ত, জিকিররত নিরীহ নিরস্ত্র লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ আলেম-ওলামার ওপর সরকার রাতের আঁধারে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে বিশেষ অভিযানের নামে নৃশংস নির্মম, বর্বর অমানবিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। সেখানে কত লোককে শহীদ করেছে সেই পরিসংখ্যান যাতে না পাওয়া যায়, সেজন্য সঙ্গে সঙ্গেই লাশ গুম করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, ট্রাক ভর্তি করে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই লাশের সংখ্যা আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। সেখান থেকে আলামত দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে আহত করা হয়েছে। আলেমদের বেইজ্জতি করে ঢাকা থেকে বের হতে বাধ্য করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়নি। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হচ্ছে। অন্যান্য শ’ শ’ আলেমকে গ্রেপ্তার করার জন্য মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

তার আগে ৫ই মে দুপুর থেকে গুলিস্তান, পল্টন, বায়তুল মোকাররম, বিজয়নগর, দৈনিক বাংলার মোড় এলাকায় বিনা উস্কানিতে পুলিশ ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা শাপলা চত্বরগামী মিছিলের ওপর হামলা চালায়। সরাসরি খুঁজে খুঁজে গুলিবর্ষণ করে অসংখ্য লোককে হত্যা ও আহত করেছে।

৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে মুসলমান শাসকের হাতে অরাজনৈতিক ঈমানী আন্দোলনরত সংগঠনের একটি শান্তিপূর্ণ অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচিতে এভাবে পাখির মতো মানুষ হত্যার ঘটনা ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিনা কারণে এই গণহত্যা বিশ্ব রেকর্ড হিসেবেও ইতিহাসে লাল অক্ষরে লেখা থাকবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় কয়েক ঘণ্টা ধরে পরিকল্পনা নিয়ে ভারি অস্ত্র নিয়ে রাস্তার আলো নিভিয়ে বর্বরতম এই কাজটি করেছে। এই নিষ্ঠুর নির্মম অমানবিক ঘটনার নিন্দা জানানোর কোন ভাষা আমাদের নেই। আমরা দেশবাসীর বিবেকের ওপর এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহ পাকের ওপর এর বিচারের ভার ছেড়ে দিলাম।
আমরা ১৩ দফা দাবি সরকারের কাছে পেশ করে সরকারকে সময় দিয়েছিলাম। সরকার ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে মুসলমানদের ঈমান-আক্বিদা সম্পর্কিত এই ১৩ দফা বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোন আশ্বাস পর্যন্ত দেয়নি। বরং তাদের অনেকে এই ১৩ দফা বাস্তবায়ন করাকে মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া, সংবিধানবিরোধী ইত্যাদি আখ্যায়িত করে উপহাস পর্যন্ত করে। আমরা ১৩ দফার  ব্যাখ্যা দিয়েছি। আইনি ব্যাখ্যাও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পাঠিয়েছি। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবির দফাভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে সবগুলো দাবি কৌশলে প্রত্যাখ্যান করেন।

এতে আরও বলা হয়, সরকার বায়তুল মোকাররমের অনুমতি না দিয়ে শাপলা চত্বরের অনুমতি দেয়। আমাদের নেতাকর্মীরা দুপুর থেকে শাপলা চত্বরে আসতে শুরু করে। কিন্তু আমরা দেখলাম, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ঢাকায় প্রবেশের পথে সর্বপ্রথম সকালে গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চের কাছে আমাদের নেতাকর্মীদের মিছিল নিয়ে আসতে বাধা দিয়ে তাদের ওপর গুলি চালায়। পরে দৈনিক বাংলার মোড় থেকে শুরু করে পল্টন, তোপখানা রোড, গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পর্যন্ত মিছিলে আক্রমণ করতে থাকে।
একদিকে শাপলা চত্বরে আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলছিল, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে সমাবেশে আসতে থাকা হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে। দুপুর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত পুরো এলাকায় পুলিশ পাখির মতো হেফাজত কর্মীদের গুলি করে হত্যা করতে থাকে। অন্যদিকে সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা কখনও স্বরূপে কখনও  হেফাজত কর্মী সেজে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করতে থাকে।

আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে সরকারকে অন্যপ্রান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানাই। কিন্তু  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি বাহিনী সন্ধ্যার পর আরও ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে শুরু করে। এরমধ্যেও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, যে করেই হোক সকালে দোয়ার মাধ্যমে সমাবেশ শেষ করে দেব। আমাদের এই ইচ্ছার কথা প্রশাসনের লোকজনকেও বার বার অবহিত করা হয়।

কিন্তু আমাদের কোন কথায় কর্ণপাত না করে নজিরবিহীনভাবে আগ্রাসী তৎপরতা চালানোয় উদ্ভূত ঘটনা আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও উসকানিমূলক মনে হচ্ছে। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, আমাদেরকে শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দেয়া, তারপর অন্যপ্রান্তে হামলা করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা, সরকারি দলের নেতার পক্ষ থেকে দুই দফায় সংবাদ সম্মেলন করে আমাদেরকে সরে যাওয়ার আলটিমেটাম দেয়া, রাতে আমাদের সমাবেশের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানোর পুরো ঘটনাই সরকারের পূর্বপরিকল্পিত। সরকার কি উদ্দেশ্যে আমাদের মতো শান্তিপ্রিয় অরাজনৈতিক মানুষগুলোকে মজলুমে পরিণত করলো আমরা জানি না।

হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি এদেশের ১৬ কোটি তৌহিদি জনতার দাবি। ৬ই এপ্রিলে লংমার্চ, ৫ই মে  ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে লাখ লাখ লোকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আলেম সমাজ ঘরে ফিরে যাবে না। সরকার আমাদেরকে আর বের হতে না দেয়ার হুমকি দিয়েছে। কোন গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজে জনগণের দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকারীদের এভাবে হুমকি দেয়ার নজির নেই।  সরকার হেফাজতের খবর প্রচার করার অপরাধে সর্বশেষ জনপ্রিয় দু’টি টেলিভিশন চ্যানেলকে বন্ধ করে দিয়েছে হত্যাযজ্ঞ চালানোর ওই রাতেই। আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, সরকার তার মনোভাব ও অবস্থান পরিবর্তন না করলে তাদের কী পরিণতি হবে আমরা জানি না। কারণ দেশের অধিকাংশ মানুষকে এভাবে দমন করে জোর করে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, এই সরকারও পারবে না। আলেম সমাজ রাজনীতি করে না। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা নামানোর জন্য আলেমদের আন্দোলন নয়।

সরকারকে সর্বশেষ সুযোগ দিয়ে বলতে চাই, দ্রুত আলেম সমাজের কাছে ক্ষমা চান, নিহত ও আহতদের পরিসংখ্যান দিয়ে তাদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করুন। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। মামলা প্রত্যাহার করুন। অবিলম্বে হেফাজত মহাসচিবসহ সকল নেতাকর্মীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করুন। হেফাজতের বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার বন্ধ রাখুন। কারণ, এদেশের কোটি কোটি তৌহিদি জনতা এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, যারা রাজপথে জীবনবাজি রেখে আল্লাহ-রাসুল ও পবিত্র কুরআনের ইজ্জত রক্ষার প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, তারা কিভাবে পবিত্র কুরআনে আগুন দেয়ার মতো জঘন্য অবমাননা করতে পারে? ঢাকা শহরে ৫ তারিখ রোড ডিভাইডারের মাঝের যে শ’ শ’ গাছ কাটা হয়েছে, তার সঙ্গেও হেফাজতের কোন কর্মী জড়িত নয়।

ঢাকার হাজার হাজার মানুষ সাক্ষী, আওয়ামী ওলামা লীগের লোকজন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে ইলেক্ট্রিক কাটার দিয়ে অল্প সময়েই শ’ শ’ গাছ কেটে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে হেফাজতের ওপর দায়ভার চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাপড়, পানির বোতল ও শুকনো খাবার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। রাস্তার পাশের শ’ শ’ গরিব মানুষের দোকানে এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকে তারা আগুন লাগিয়ে ও লুটপাট করে হেফাজতের ওপর দোষ চাপায়।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, হাফেজ মুহাম্মদ শামসুল আলম, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা লোকমান হাকিম, কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ তৈয়্যব, মাওলানা আবু তাহের আরবী, মাওলানা হাবীবুল্লাহ, মাওলানা নুরুল ইসলাম, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, মাওলানা হারুন বিন ইজহার, মাওলানা মাহমুদুল হাসান ফতেপুরী, মাওলানা ইয়াসীন, মাওলানা আলমগীর, মাওলানা এমরান প্রমুখ।

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers