এখন পড়ছেন
সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের মানুষ বাক-অবরুদ্ধ: সাক্ষাৎকারে আসাফউদ্দৌলা

বাংলাদেশে এখন কোনো ব্যক্তিকে আটকের পরই নেয়া হচ্ছে রিমান্ডে। সুস্থ মানুষ ধরে পুলিশি রিমান্ডের নেয়ার পর বের করা হচ্ছে অসুস্থ করে। এ কারণে রিমান্ড নিয়ে বাংলাদেশে উঠেছে নানা বিতর্ক। আইনের দৃষ্টিতে রিমান্ড কতটা সঠিক তা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছ। এরকম পরিপ্রেক্ষিতে রেডিও তেহরান কথা বলেছে সাবেক পানিসম্পদ সচিব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাব আসাফউদ্দৌলার সঙ্গে। বাংলার গান গাই পাঠকদের জন্য  সাক্ষাতকারটি এখানে উপস্থাপন করা হল:

রেডিও তেহরান : জনাব আসাফউদ্দৌলা!  আজকাল পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে আটকের পর প্রথম যে কাজটি করছে তা হলো- আদালতে রিমান্ডের আবেদন করছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আদালতও তা মঞ্জুর করে দিচ্ছে; এ ক্ষেত্রে দু’সপ্তাহ/তিন সপ্তাহ পর্যন্ত রিমান্ড দেয়া হচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে এটা কতটা সঠিক?

আসাফউদ্দৌলা : দেখুন, আমরা যখন জুডিশিয়ারিতে ছিলাম তখন এ রকম নিয়ম ছিল না। নিয়ম হচ্ছে- কারো বিরুদ্ধে নালিশ এলে অথবা কারো বিরুদ্ধে কোন অপরাধের অভিযোগ এলে প্রথমে একটা তদন্ত হবে। তদন্ত শেষে চার্জশিট দেয়া হবে। চার্জশিটের দিন শুনানি হবে আসামীর উপস্থিতিতে। যদি মনে হয়  It is a very serious kind of offence –সেক্ষেত্রে তাকে জেলে পাঠানো হতো। এই রিমান্ডে পাঠাবার ক্রিটিক্যাল বিষয়টি এসেছে  CRPC- section 167 । এই সেকশনে রিমান্ডে পাঠানো হয়। তবে রিমান্ডে পাঠানোকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আমি মনে করি। রিমান্ডে নিয়ে মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এমন যদি হতো যে অভিযুক্তের আইনজীবীর সামনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সেটা সমর্থন যোগ্য। অথবা তার স্ত্রী বা বন্ধুর সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সেটাকেও মানা যায় এবং রিমান্ডকে এত ভয় পাবার কারণ ছিল না। কিন্তু যখন কোন আসামীকে বা অভিযুক্তকে একাকী নিয়ে যাওয়া হয় রিমান্ডে তখন তাদের ওপর প্রায়ই অত্যাচার করা হয়। রিমান্ডে নিয়ে অনেক বেশি অত্যাচারের কাহিনীও আমরা শুনেছি। সুতরাং রিমান্ডকে আমরা সভ্য states legitimate বলতে পারি না। রিমান্ড বর্তমানে কোর্টের এখতিয়ার কিন্তু এই এখতিয়ারের প্রয়োগ পুলিশের অধীনে নির্বিচারে করা হলে তা রুদ্ধদ্বার অত্যাচারের পথ খুলে দেবে। সুতরাং রিমান্ড আমাদের কাছে মানবাধিকার পরিপন্থী বলে মনে হয়। you are sending to jail but why send him to remand  to extract confession?

মানুষকে মারা হলে বা নির্যাতন চালানো হলে তো মানুষ কনফেস করবে। তবে সেই কনফেশনের দাম নেই কোর্টে। আর আজকাল পুলিশের কাছে দেয়া কনফেশনস যদি  কোর্টে গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে তো ল’জ অ্যান্ড জুরিস প্রুডেন্স থাকে না, আইনের শাসনও থাকে না। আমার মনে হয় রিমান্ডের নামে যেটা হচ্ছে এটা না হলে ভাল হয়। একটা সভ্য দেশে এটা হওয়া উচিত না এবং না হওয়াই সঙ্গত।

রেডিও তেহরান:  আজকাল আরেকটি কথা শোনা যাচ্ছে- রিমান্ড মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানছে না। কথাটা কতটা সত্য? যদি এমনটি হয়েই থাকে তাহলে উচ্চ আদালতের অবমাননা হচ্ছে কিনা?

আসাফউদ্দৌলা : ডেফিনেটলি উচ্চ আদালতের অবমাননা হচ্ছে। রিমান্ডের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের কতগুলো নির্দেশনা আছে। সেগুলো নিম্ন আদালত মানতে বাধ্য। সেগুলো যদি না মানে নিম্ন আদালত সেক্ষেত্রে আসামী পক্ষের উকিল কনটেম্পট অব কোর্টে কেস করতে পারে নিম্ন আদালতের বিরুদ্ধে। আমাদের সময়ে এগুলো হতো কিন্তু বর্তমানে নিম্ন আদালতে এগুলো হচ্ছে না এবং হায়ার কোর্টও এগুলো নিয়ে সেভাবে পারসু করছেন না। উচ্চ আদালতকে আরো যদি sensitize করা যায় এবং নিম্ন আদালত যাতে করে তাদের আদেশ মানেন সে ব্যাপারে আরো সক্রিয় হন তাহলে হয়ত এগুলো করা যেত।

রেডিও তেহরান : রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে যে অবস্থা চলছে তা কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাবে নাকি বিচার বিভাগ স্বাধীনতা চর্চা করছে না? এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কোন পর্যায়ে?

আসাফউদ্দৌলা :  শুনুন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নিয়ে কোন কথা বলা যাবে না। অনেককে নিয়ে কথা বলা যাবে না। কথা বলা যাবে না সরকারকে নিয়ে। সংবিধান এবং রেফারেন্ডাম নিয়ে কথা বলা যাবে না। এক কথায় বাংলাদেশের মানুষ বাক-অবরুদ্ধ। আর এই বাক-অবরুদ্ধ অবস্থায় আমরা মানুষেরা যতদিন থাকতে পারি থাকব। কোন কিছু নিয়ে কথা বললে মাহমুদুর রহমানের মত অবস্থা হবে।

রেডিও তেহরান : জনাব আসাফউদ্দৌলা প্রসঙ্গ ধরেই আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের আটক ও রিমান্ড নিয়ে একটি প্রশ্ন করতে চাই-তাহলো যে অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে তা কতটা যৌক্তিক এবং একজন সম্পাদককে এভাবে রিমান্ডে নেয়া কতটা আইনসঙ্গত? তার রিমান্ড আদেশকে কিন্তু এরইমধ্যে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

আসাফউদ্দৌলা : মাহমুদুর রহমানকে ধরবার কারণ কি ছিল? মাহমুদুর রহমান অন্য দেশের  একটি খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি আইটেম সেই কাগজের অনুমতি নিয়ে তার পত্রিকায় ছেপেছে। সুতরাং এতে তার কোন অপরাধ হয়নি। তবে যেহেতু সেই সংবাদটি সরকারের বিরুদ্ধে গেছে সে কারণে বিনা অপরাধে সরকার তার ওপর চড়াও হয়েছেন। বড় দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছি- My heart bleeds for Mahamudur Rahman. মাহমুদুর রহমানের মাকে পর্যন্ত গ্রেফতারের অর্ডার দিয়েছে, প্রেস বন্ধ করে দিয়েছে। তো এইভাবে যদি অত্যাচার চলে সেই দেশ আবার তথ্য অধিকার আইন পাস করে; লজ্জা করে না !

রেডিও তেহরান :  আচ্ছা, বাংলাদেশে যে প্রেস কাউন্সিল রয়েছে তার বর্তমান ভূমিকা কি এবং মাহমুদুর রহমান প্রশ্নে এ প্রতিষ্ঠানকে কি ব্যবহার করা যেত? এমন ধরনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি নিজে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি?

আসাফউদ্দৌলা : দেখুন! এখানে প্রেস কাউন্সিল বলে সরকারের নিয়োজিত একটি অর্গানাইজেশন আছে। প্রেসের সঙ্গে সরকারের বিবাদের বিষয়গুলোর ব্যাপারে প্রেস কাউন্সিল  ডিসাইড করবে। তো সেক্ষেত্রে সরকার মাহমুদুর রহমানের ব্যাপারে যে বিবাদটি হয়েছে তা নিয়ে প্রেস কাউন্সিলে যেতেন এবং সেখানে বলতেন এই এই অপরাধ সে করেছে বলে আমরা মনে করছি। তার বিরুদ্ধে বিচারের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এখানে প্রেস কাউন্সিল হচ্ছে প্রেস সম্পর্কিত বিতর্কের সমাধানে জুডিশিয়াল বডি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রেস কাউন্সিলই এসব বিষয়ের সমাধান দেয়। তারা Arbitration-ও করে দিতে পারে, শাস্তিও দিতে পারে এবং ফাইনও করতে পারে। তো প্রেস কাউন্সিলকে বাদ দিয়ে সরকার- বিষয়টি সরাসরি একেবারে পুলিশ, থানা, হাজত এবং রিমান্ড এগুলো করেছে। আমার কাছে এগুলো মনে হয় These are oppressive steps taken by a desperate goverment.

রেডিও তেহরান : সর্বশেষ আমরা যে প্রশ্নটি জানতে চাই তা হলো- রিমান্ডের কিছুটা ঐতিহাসিক দিক এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট। এই আইন তো ব্রিটিশ শাসনামলে করা হয়েছিল এবং রিমান্ডে নিয়ে তখন বাংলা অঞ্চলের মানুষকে নির্যাতন করা তাদের জন্য কঠিন কিছু ছিল না। কারণ এ দেশের জনগণের প্রতি তাদের কোনো দয়ামায়া থাকার কথা না। কিন্তু এখন তো স্বাধীন দেশ এবং যাদেরকে রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে তারা এ দেশেরই মানুষ। তাদের ওপর এখনো কেন রিমান্ড নামের নির্যাতন চালানোর ভয়াবহ ব্রিটিশ কৌশল প্রয়োগ করা হবে?

আসাফউদ্দৌলা : দেখুন! সেই জন্যই তো আমাদের দুঃখ বেশি। বাংলাদেশের সংসদ কি করে! সংসদের উচিত অবিলম্বে রিমান্ড নামক সিআরপিসির ১৬৭ নং এই ধারাটি অবিলম্বে উচ্ছেদ করা। আমরা দেখেছি প্রতিটি সংসদের অপজিশনরা বলে আমরা ক্ষমতায় গিয়েই এগুলো বদলে দেব। কিন্তু বাস্তবে কেউই ক্ষমতায় এসে এগুলো  বদলায় না উপরন্তু এগুলো আরো বেশি করে ব্যবহার করতে থাকে। সুতরাং এটা একটা ট্রাজেডি যে সংসদ আজ পর্যন্ত সিআরপিসিতে যে  কতগুলো বাজে ধারা আছে সেগুলো বাদ দেয়ার কোন উদ্যোগ আজ পর্যন্ত নেয়নি। কোন সরকারই এ উদ্যোগ নেয়নি। আমার জীবনের এটা একটা বড় আক্ষেপ যে, এদেশের পার্লামেন্টের যে ভূমিকা তা দুঃখজনক। বাংলাদেশে এত বেশি মিস ইউজ হয় যে দু’টি আইন- সে দু’টি আইনের ব্যাপারে সংসদে বিরোধী দলে থাকতে সবাই সোচ্চার থাকেন যখন তারা সাফার করেন কিন্তু তারা যখন ক্ষমতায় যান তখন তারা এগুলো ভুলে যান। স্বাধীন দেশে এই ধরনের আইন থাকতে পারে না।

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers