এখন পড়ছেন
খবর

আহত রশিদকে আটকের পর আবারও গুলি করে হত্যার অভিযোগ

Rashid_CBপুলিশের গুলিতে আহত আবদুর রশিদকে টেনেহিঁচড়ে কক্সবাজারের ঈদগাঁও তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে যান পুলিশের দুই-তিন সদস্য। সেখানে আটকে মাটিতে ফেলে তার শরীর লক্ষ্য করে আরেকটি গুলি চালানো হয়। গুলিটি দেহের একপাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এ সময় পুলিশ সদস্যদের ‘ভাই, বাবা, স্যার’ সম্বোধনসহ শত আকুতি-মিনতি সত্ত্বেও পুলিশের গুলি থেকে রেহাই পাননি রশিদ। আহত হওয়ার প্রায় চার ঘণ্টা পর রশিদকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানেও যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ঈদগাঁও এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত আবদুর রশিদের স্ত্রী ও ভাইরা এ অভিযোগ করেছেন। মারা যাওয়ার আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশের এ নৃশংসতার কথা স্বজনদের জানিয়েছেন রশিদ।

জামায়াত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের খবর শুনে এলাকাবাসীর সঙ্গে রশিদও বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি ও লাঠিপেটা করে পুলিশ। একই কায়দায় গুলি চালানো হয় চকরিয়ার দোকানদার আকতার কামাল সাগরের ওপর। বিক্ষোভ চলা অবস্থায় বন্ধ দোকানের ভেতরে ঢুকে পুলিশ সদস্যরা আটক করে গুলি চালায়। এ সময় পুলিশের হামলায় আরও কয়েকজন আহত হন। রশিদ-সাগরের মতো আটক করে কক্সবাজার শহরের রুমালিয়ারছড়ায় খুব কাছ থেকে পুলিশ গুলি করেছে কৃষক নবাব মিয়াকে। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়।

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা নবাব মিয়াকে গুলি করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে রশিদ ও সাগরকে আটকের পর গুলি করার বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেছে পুলিশ। ১৫ ও ২৮ ফেব্রুয়ারির পৃথক আন্দোলনে কক্সবাজার জেলায় নিহত হন ৬ জন; আর আহত হন অনেকে।

রশিদের স্ত্রী মরিয়ম স্বামীর মৃত্যু সম্পর্কে বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রশিদের সঙ্গে তার দুবার মোবাইলে কথা হয়। ওই সময় পুলিশের গুলি করার বিষয়টি তাকে জানান রশিদ। তিনি বলেন, রশিদ কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তিনি মাওলানা সাঈদীর ওয়াজের ভক্ত।

স্থানীয় আলমাছিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করার পর ২০০৯ সালে তিনি কাজের সন্ধানে দুবাই চলে যান, ফিরে আসেন ২০১১ সালে। আবারও বিদেশ যাওয়ার জন্য কয়েক দিন আগে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টও (এমআরপি) করিয়েছিলেন। রশিদের দুই ছেলে। লোকমান হোসেন (৫) ও তামিম ইকবাল (তিন বছর ১০ মাস)। মরিয়ম জানান, বেলা ১টায় মোবাইলে কথা হলে রশিদ ঈদগাঁও বাজারে রয়েছেন বলে জানান। বেলা সোয়া দুইটায় রশিদের মোবাইল থেকে ফোন আসে। রশিদ জানান, তার হাতে পুলিশের একটি গুলি লেগেছে। তাকে বিটে (পুলিশ ফাঁড়িতে) আটকে রেখেছে। এ কথা বলার পরই কেউ লাইন কেটে মোবাইল বন্ধ করে দেয়।

খবর পেয়ে রশিদের বড় ভাই নুরুল আমিনকে নিয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। কিন্তু পথে সংঘর্ষের কারণে ফাঁড়িতে যেতে পারেননি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় চার ঘণ্টা পর রশিদকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। এর আগে চার ঘণ্টা তাকে ঈদগাঁও পুলিশ ফাঁড়িতেই ফেলে রাখা হয়। এতে রশিদের দেহ থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। পরে পুলিশের তত্ত্বাবধানে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়।

মরিয়ম জানান, তার আত্মীয় স্থানীয় ব্যবসায়ী বেলালকে ফোন করে হাসপাতালে যাওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। ফাঁড়িতে পুলিশ যে গুলি করেছে তা হাসপাতালের বেডে শুয়ে বেলালকে জানায় রশিদ।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রশিদের সঙ্গে আবারও ফোনে কথা হয়। ওই সময়ও রশিদ ক্যাম্পের ভেতরে গুলি করার বিষয়টি তাওে জানান। এক প্রশ্নের জবাবে মরিয়ম বলেন, আটকের পরই পুলিশ ফাঁড়িতে থাকাবস্থায় প্রথম ফোনে রশিদ একটি গুলির কথা বলেন। পুলিশ হেফাজতে চিকিত্সার সময় দুটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাহলে দ্বিতীয় গুলি অবশ্যই পুলিশ ফাঁড়িতে করা হয়।

সংঘর্ষ অবস্থায় বেলা ৩টার পর তদন্ত কেন্দ্রের আশপাশের ভবন থেকে কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। তারা তদন্ত কেন্দ্রের আশপাশের দোকানের বিক্রেতা।

আটক একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশ-কে বলেন, সংঘর্ষ শুরুর পরই দোকান বন্ধ করে একটি ভবনে আশ্রয় নেই। পুলিশ আটক করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে আবদুর রশিদকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। তার পা ও হাতে তাজা রক্তের ছাপ ছিল। ওই সময় রশিদসহ তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছটফট করতে দেখেছি। এদের মধ্যে একজনকে আর্তচিত্কার করতেও শুনেছি।

স্থানীয় আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ফাঁড়িতে আটকদের মারধর করতে দেখেছি। তবে গুলি করার বিষয়টি জানি না। সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইছাখালী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রেদওয়ান বলে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রশিদ মামা রাস্তায় পড়ে ছিলেন। দুই-তিন পুলিশকে দেখেছি তাকে ধরে টানতে টানতে ফাঁড়িতে নিয়ে যেতে।

এ বিষয়ে ফাঁড়ির দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, সংঘর্ষের সময় তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ছিলেন এসআই মঞ্জুর কাদের। ঘটনার পর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মঞ্জুর কাদের বলেন, আবদুর রশিদকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার অনেক পরে বিকাল ৩টার দিকে আমি ক্যাম্পে যাই। পুলিশ সদস্যরা তাকে গুলি করেছে—এমন কথা আমি শুনিনি।

রশিদের ভাই নুরুল আমিন বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রশিদ মারা গেলেও লাশ ফেরত দিতে টালবাহানা করা হয়। সাদা কাগজে আমি স্বাক্ষর না করলে লাশ দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। বাধ্য হয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে লাশ নিয়েছি। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় আমার আত্মীয়স্বজনকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। এর পর থেকে আমরা আতঙ্কে রয়েছি।

এসব বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. আজাদ মিয়া বলেন, ঢালাওভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সুযোগ নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটতে পারে।

ফাঁড়ির ভেতর নিয়ে রশিদকে গুলি করার বিষয়ে জানেন না দাবি করে  বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। নবাবকে মারপিটের ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ ও গুলি করায় আত্মরক্ষার্থে আমরা গুলি করেছি। হামলায় আমাদের অনেক সদস্য আহত হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংঘর্ষে পুলিশের অনেক সদস্য আহত হয়েছেন, কিন্তু গুলিবিদ্ধ হননি।

একই ঘটনায় আবদুর রশিদের সঙ্গে আটক হয়েছিলেন আরও কয়েকজন। এদের মধ্যে ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রেই শফিউল আলম নামের একজনকে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় লাথি মেরে ক্যাম্পের বারান্দায় ফেলে ডান পায়ের হাঁটুর উপরে ও নিচে গুলি করা হয়। এছাড়া মিজান, ছাদেক ও আবদুল্লাহ নামের আরও তিনজনকে মারপিট করে রক্তাক্ত ও বিকলাঙ্গ করা হয়। নিহত আবদুর রশিদের বাবা হাজী মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া দায়ের করা পুত্রহত্যা মামলার আরজিতে এসব অভিযোগ উল্লেখ করেন। মামলাটি ২৫ মার্চ কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলেও শুনানি শেষে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা পর মামলাটি খারিজ করা হয়।

সুত্র: আমার দেশ, মার্চ ৩০ ২০১৩

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers