এখন পড়ছেন
খবর

আরো সাতটি লাশ

1st-112২৯ মার্চ, শুক্রবার পুলিশের নির্বিচারে গুলিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে তিনজন এবং সিরাজগঞ্জের বেলকুঁচিতে দু’জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৭৫ জন। এ দিকে খুলনায় বিএনপির দুই নেতা নিহত হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আগামীকাল রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও খুলনায় সকাল-সন্ধ্যা এবং সিরাজগঞ্জে আধাবেলা হরতাল আহ্বান করা হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরে গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে এক কিশোরসহ তিন নিরীহ গ্রামবাসী নিহত এবং প্রায় অর্ধশত  আহত হয়েছেন। হতাহতরা সবাই বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থক বলে দাবি করেছে স্থানীয় ১৮ দল। এই ঘটনাকে গণহত্যা দাবি করে আগামীকাল রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছেন ১৮ দলের নেতারা। এ ছাড়া ঘটনার প্রতিবাদে জেলার বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করেছেন বিুক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা। সকাল থেকে তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে শিবগঞ্জের শ্যামপুর ইউনিয়নের গোপালনগর এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশের গ্রেফতার অভিযানের সময় বিুব্ধ জনতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে রাত ৩টার দিকে পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করলে তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহতরা হলেন- উমরপুর গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে স্থানীয় স্বরূপনগর দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণীর ছাত্র অলিউল্লাহ (১৭), শ্যামপুর গ্রামের ভদু আলীর ছেলে রবিউল ইসলাম রবু (২৫) এবং শ্যামপুর চামাবাজার এলাকার জিল্লুর রহমানের ছেলে মতিউর রহমান (২৫)। নিহত মতিউর ও রবিউল পেশায় কৃষক বলে জানিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়াও আরো অন্তত ৬০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ৱ

ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে কানসাটে নিয়ে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আবারো শ্যামপুরে অভিযান চালিয়ে অন্তত ২৫ জনকে গ্রেফতার করে।

এ দিকে ঘটনার পর শুক্রবার সকাল থেকেই বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ স্থলবন্দর মহাসড়কের অন্তত ১৫টি পয়েন্টে গাছের গুঁড়ি ও বৈদ্যুতিক পোল ফেলে তারা সড়ক অবরোধ করে। এতে সকাল ৭টার পর থেকেই সোনামসজিদ স্থলবন্দরের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু এলাকায় ব্যারিকেড দেন জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এ সময় তারা বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করেন। একই সময় শহরের সিসিডিবি মোড় এলাকাতে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার বশির আহম্মেদ সাংবাদিকদের জানান, আসামি ধরার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা শ্যামপুর এলাকায় গেলে আসামি পরে লোকজন যৌথ বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ আত্মরার্থে গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেটসহ যৌথ বাহিনীর ১২ সদস্য আহত হন বলে দাবি করেন তিনি।

সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচিতে আওয়ামী লীগ-পুলিশের সাথে সংঘর্ষকালে গুলিতে জামায়াত ও শিবিরের দু’জন নিহত হয়েছেন। এ সময় বিটিভি ও মাইটিভির সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। নিহতরা হলেন- বেলকুচি উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে নবম শ্রেণীর ছাত্র, কল্যাণপুর ইউনিট ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউনুস আলী (১৪) ও সর্বতুলশী গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে জামায়াতকর্মী ও কল্যাণপুর ইউনিট জামায়াতের সেক্রেটারি ফরিদুল ইসলাম (২২)। নিহত দু’জন শিবির ও জামায়াতের একনিষ্ঠ কর্মী বলে নিশ্চিত করেছেন বেলকুচি উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম সোহেল।

প্রত্যদর্শীরা জানান, গত ৩ মার্চ হরতাল চলাকালে আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি আটকের জন্য প্রাণী ও মৎস্যসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস পুলিশকে নির্দেশ দিলে পুলিশ চার-পাঁচটি হোন্ডাযোগে সিভিল পোশাকে গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মধুপুর বাজারে চা দোকানদার জামায়াতকর্মী হাবিবুর রহমানকে আটক করে।

খবর পেয়ে এলাকাবাসী লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে এলে পুলিশ দ্রুত আসামিসহ থানায় চলে আসে। পুলিশ ফিরে এসে গ্রামবাসীর ঐক্য দেখে অপারগতা প্রকাশ করলে মন্ত্রীর ছেলে মিঠু বিশ্বাস, আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ যৌথ অভিযানে অবতীর্ণ হয়। তারা অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করতে করতে এগোতে থাকে। তাদের অবিরাম গুলিবর্ষণে অন্তত ৩০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও কিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে নেয়ার পথে জামায়াত ও শিবিরের দুই জন মারা যান। এ ঘটনার পর জামায়াত নেতাকর্মী এবং গ্রামবাসী নারী-পুরুষ কল্যাণপুর মাঠে সমবেত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের প্রতিরোধের মুখে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগ ও পুলিশের হামলায় এলাকার হাজার হাজার মানুষ শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললে ধাওয়া-পালটাধাওয়া চলতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ প্রায় ১৪৩ রাউন্ড টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে জামায়াত ও শিবিরের দুই কর্মী নিহত হন।

এদিকে খুলনায় বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতা নিহত হয়েছেন। তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: বুলু মোল্লাকে (৪৫) পিটিয়ে ও কুপিয়ে এবং ডুমুরিয়া উপজেলা সদর ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি গাজী নাসিমউদ্দিন সুমনকে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহত দু’জনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, গত বুধবার রাতে উপজেলার গাজীরহাটে জারিগান শুনতে যাওয়ার কথা বলে বুলুকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এরপর বুলুর বাড়ি থেকে কয়েক মাইল দূরে কুলা গ্রামে নিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ খবর পেয়ে স্থানীয় একজন মহিলা মেম্বার ঘটনাস্থলে গেলে তার সামনেই বুলুর দুই হাত ও পা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। পরে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে বুলুকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ মধুপুর ইউনিয়নের কুলা বাড়ি গ্রামে নেয়া হয়। রাত ১০টায় স্থানীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিহত বুলুর নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত বুলুর নাতি ও মধুপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, পূর্বশত্রুতার জের ধরে তার দাদা বুলুকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত এটা সবাই জানে।

তেরখাদা থানার ওসি আনোয়ার হোসেন জানান, মধুপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইলিয়াস মোল্লার ভাইপো বুলুকে পূর্বশত্র“তার জের ধরে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। কেউ গ্রেফতারও হয়নি।

এ দিকে ডুমুরিয়া এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলা সদরে হরতালের সমর্থনে ১৮ দলীয় জোটের মিছিলে অংশগ্রহণের পর যুবদল নেতা গাজী নাসির উদ্দীন সুমন তার বাড়ির পাশে একটি দোকানে বসেছিলেন। এ সময় স্থানীয় যুবলীগ নেতা বুলু ও মুকুলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী তাকে বেদম মারধর করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় সন্ধ্যার দিকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ সময় তিনি রক্তবমি করতে থাকেন। পুলিশ তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর সিটি স্ক্যানে তার মস্তিষ্কে রক্তরণ ধরা পড়ে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে পুলিশি হেফাজতে ঢাকায় পাঠানো হয়। পথিমধ্যে রাত ২টার দিকে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় পৌঁছলে তার মৃত্যু হয়। সুমনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহত সুমন ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের গাজী আতিয়ার রহমানের ছেলে।

ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম মশিউর রহমান জানান, মো: বেলাল হোসেন বাদি হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ২০-২৫ জনের নামে দ্রুত আইনে মামলা করে। মামলায় বলা হয়, আসামিরা গাজী মোটরস, লাকি এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করে। এই মামলায় যুবদল নেতা সুমন তার ভাই টটুলসহ তিনজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি অভিযোগ করেন, পুলিশ হেফাজতে নেয়ার পর তাদের ওপর আবারো নির্যাতন করা হয়। রাত ১০টার পর যুবদল নেতা সুমন রক্তবমি করলে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি ফরিদপুরের ভাঙ্গা যাওয়ার পর সুমনের অবস্থা আরো অবনতি হয়। এ সময় তাকে দ্রুত ভাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে রাত ২টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। গতকাল নিহত যুবদল নেতার লাশ ফরিদপুর হাসপাতালে নিয়ে ময়নাতদন্ত শেষে খুলনায় পাঠানো হয়।

এ দিকে বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতা নিহত হওয়ার প্রতিবাদের আগামীকাল রোববার খুলনায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালসহ তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

 

 

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers