এখন পড়ছেন
সাক্ষাৎকার

ঈমান ও শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থেই হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন- সাক্ষাৎকারে আল্লামা শফী

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেছেন, হেফাজতে ইসলাম মূলত দ্বীনি, ইসলাহী ধর্মীয় ও সংস্কার কাজে নিয়োজিত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠা থেকে এ পর্যন্ত কখনো এই সংগঠনটি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে যায়, এমন কোনো দাবি বা কর্মসূচি দেয়নি। জনসাধারণের ঈমান-আকিদা ও দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন।  ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারী নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে আমাদের চলমান আন্দোলনেও আমরা যে ১৩টি দাবি উপস্থাপন করেছি, তার মধ্যেও কোনো রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট দাবির অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না। আমাদের দাবি ও প্রতিবাদ কর্মসূচি একান্তই ঈমান-আকিদা, ইসলাম ও নৈতিকতা সংশ্লিষ্ট। তিনি আগামী ৬ এপ্রিল ঢাকায় লংমার্চের  জনসমাগম প্রসঙ্গে বলেন,  হেফাজতে ইসলাম যে ডাক দিয়েছে, তাতে যে সাড়া মিলছে, আমরা আশাবাদী, সরকার কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করলে এই লংমার্চে অন্তত ৫০ লাখ লোক জমায়েত হবে ইনশাল্লাহ।

আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী

আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীলাহ।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে  বর্ষীয়ান এই আলেমে দ্বীন বলেন, দেশের ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ছোটখাটো মতভেদ থাকলেও ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস ও কৃষ্টিকালচারের ওপর কোনো আঘাত এলে আমরা দ্রুত সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পড়ি। আমাদের অরাজনৈতিক কর্মসূচির পক্ষে দলমত নির্বিশেষে বিশাল জনগোষ্ঠীর জোরালো সমর্থন রয়েছে। সুতরাং যখনই ইসলাম ও মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাস ও কৃষ্টিকালচারের ওপর আঘাত আসবে, তখনই হেফাজতে ইসলাম তৎপর ভূমিকা রাখবে। আমি জোরালো আশাবাদী, হেফাজতে ইসলামের অরাজনৈতিক এই আন্দোলন দেশের ওলামা-মাশায়েখ স্থায়ীভাবে অব্যাহত রাখবেন।  আমরা ইসলামবিরোধী আগ্রাসন প্রতিরোধে আল্লাহর ওপর ভরসা করে ময়দানে নেমেছি। দলমত নির্বিশেষে সব মুসলমান আমাদের সমর্থন করছেন। ইনশাআল্লাহ  ইসলাম ও মুসলিম জীবনধারা নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি আপনাদের মাধ্যমে সমালোচনাকারীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, তারা প্রমাণ করে দেখাক, হেফাজতে ইসলাম ও ওলামা-মাশায়েখের কোনো দাবির সাথে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যখন হেফাজতে ইসলামের ন্যায্য দাবিতে সারা দেশ উত্তাল, তখন ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক ব্লগার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা তাদের অন্যায় অবস্থানের সপক্ষে কোনো যুক্তি খুঁজে না পেয়ে হেফাজতে ইসলাম ও আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও জঙ্গিবাদের কল্প নাটক সাজিয়ে বিষোদগারমূলক বক্তব্য রাখছেন।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নাম হেফাজতে ইসলাম ও আল্লামা শাহ আহমদ শফী। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বদানকারী কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে রাসূল সা: ও ইসলাম অবমাননার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ কর্মসূচি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সবার নজরে আসে। ইসলাম ও রাসূল সা: অবমাননার সাথে জড়িত ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ব্যাপক জনসমাগমে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদী অবস্থান, মানববন্ধন, উপজেলা পরিষদ ঘেরাও এবং স্মারকলিপি প্রদানসহ হেফাজতে ইসলামের বেশ কিছু কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দাবি আদায় না হলে আগামী ৬ এপ্রিল দেশের সব জেলা থেকে ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ইতোমধ্যেই হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে সংগঠনটি ব্যাপক প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

দেশের ওলামা-মাশায়েখের মধ্যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই আলেম হেফাজতে ইসলাম ছাড়াও উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রয়েছেন। উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম হাটহাজারীর মহাপরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি দীর্ঘ দিন ধরে। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এবং বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া থানাধীন পাখিয়ার টিলা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনে দারুল উলূম হাটহাজারীতে অধ্যাপনা শেষে উচ্চতর শিক্ষার্জনের জন্য ১৯৫১ সালে ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দে চার বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি দারুল উলূম হাটহাজারীতে শিক্ষকতায় যোগদান করেন এবং ২৭ বছর ধরে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রের সাথে দীর্ঘ দিন যুক্ত থাকার কারণে সারা দেশে রয়েছে তার লাখ লাখ ছাত্র, মুরিদ, ভক্ত ও খলিফা। কওমি ধারার ৪০ হাজার মাদরাসার প্রায় প্রত্যেকটির শিক্ষকতা ও পরিচালকের পদে রয়েছে তার অগণিত ছাত্র। এ ছাড়াও তার শত শত খলিফা বা প্রতিনিধির মাধ্যমে আরো লাখ লাখ ভক্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে দেশের সর্বত্র এবং বহির্বিশ্বের অনেক স্থানে। দেশের ওলামা-মাশায়েখ এবং ইসলামি রাজনীতির সাথে জড়িত শীর্ষ আলেমদের মধ্যে সমবয়সী দু-একজন ছাড়া প্রায় সবাই তার ছাত্র, মুরিদ অথবা ভক্ত। তাই ইসলাম ও মুসলমানদের যেকোনো সঙ্কটে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর আহ্বানে পারস্পরিক মতভেদ ভুলে সবাই ছুটে যান তার কাছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কখনো নিজেকে জড়াননি। তবে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রয়োজনে সাড়া দিতেও কখনো দেরি করেন না তিনি। এ কারণে বহুধাবিভক্ত ইসলামি নেতৃবৃন্দের ঐক্যের প্রতীকও বলা হয় আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে। সব মিলিয়ে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর দেশে-বিদেশে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা রয়েছে।

আল্লামা শফীর সাক্ষাতকারটি নিম্নরূপ:

প্রশ্ন : হেফাজতে ইসলাম গঠন করার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলুন।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : মুসলমানদের ঈমান-আকিদা, নীতি-আদর্শ, কৃষ্টিকালচার, সঠিক ধর্মীয় বিধিবিধান ও অনুশাসনের সুরক্ষা এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবেলায় ওলামা-মাশায়েখ এবং তৌহিদি জনতার সম্মিলিত কর্মপন্থা নির্ধারণ ও পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যেই ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও নীতি সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে। আমি আবারো স্পষ্ট করছি, আমাদের সব কর্মসূচিই শুধু ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট, দেশাত্মবোধক, শান্তিপূর্ণ এবং অরাজনৈতিক।

প্রশ্ন : ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক কেন?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : দেখুন, আমাদের আন্দোলন ঢালাওভাবে সব ব্লগ বা ব্লগারের বিরুদ্ধে নয়। আমরা জানি, সাধারণ মুসলমান, ছাত্র-শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাজীবীর অনেকেই ব্লগ লিখে থাকেন। আলেম ও মাদরাসাছাত্রদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্লগার রয়েছেন। আমাদের প্রতিবাদী আন্দোলন কেবল সেসব ব্লগারের বিরুদ্ধে, যারা মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার আড়ালে কোটি কোটি মানুষের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, প্রিয় নবী রাসূল সা:, পবিত্র কুরআন ও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে জঘন্য কুৎসা ও অবমাননায় জড়িত। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে এবং সভ্যতা-ভব্যতা ও গণতন্ত্রের কোনো মাপকাঠিতেই এমন কুৎসা ও অবমাননা মেনে নেয়া যায় না। তারা ইসলামের এমন জঘন্য অবমাননা করেছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের কোনো অমুসলিমের মুখেও কখনো শোনা যায়নি। সুস্থ বিবেকের কোনো মুসলমানের পক্ষে এসবের সম্পূর্ণটা পড়ে দেখার সাধ্যও নেই। শুরু থেকেই আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা, ইসলামবিরোধী নারীনীতি ও ধর্মহীন শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে আসছি। কয়েক বছর যেতে না যেতেই বর্তমান সরকারের গৃহীত এসব নীতির মারাত্মক কুফল শুরু হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : হেফাজতে ইসলামের চলমান আন্দোলনের দাবি নিয়ে  কোনো কোনো মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।  এ ব্যাপারে একটু বলবেন?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : আমরা জনসমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও পত্রিকায় বিবৃতি দেয়ার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের দাবিগুলো বারবার তুলে ধরেছি। আমাদের প্রধান দাবি হচ্ছে, সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইন পাস। পাশাপাশি ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন ব্লগ ও সাইটে মহান আল্লাহ, রাসূল সা: এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেসব অবমাননাকর জঘন্য কটূক্তিকর প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে, সেসব বন্ধ এবং বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্লগ, ব্লগার ও পোস্টদাতাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা। পাঠ্যবইয়ের সব ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য ও উদ্ধৃতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে অবিলম্বে সংশোধনী প্রকাশ। সব অনাচার, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা এবং নাটক-সিনেমায় ব্যক্তিজীবনে ধর্মীয় নিদর্শন তথা দাড়ি-টুপি, হিজাব ও ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে অবমাননা রোধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দান। শিক্ষার সব স্তরে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি। আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি, আমাদের সব দাবিই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং সব নাগরিকই এতে একমত পোষণ করবেন বলে আশাবাদী। সরকার দেশ, জনগণ ও মুসলমানদের স্বার্থে আমাদের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নিলেই চলমান আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়। আমরা বারবারই বলে আসছি, আমরা ক্ষমতার অংশ হতে চাই না। জনসাধারণের ঈমান-আকিদা ও দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদেই আমাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি।

প্রশ্ন : সংবিধান সংশোধনের ফলে যে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে, এ ব্যাপারে আপনার অবস্থান কী?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : ইসলাম ও রাসূল অবমাননাবিরোধী চলমান আন্দোলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উত্থাপিত ১৩ দফা দাবির প্রথম দাবিই হচ্ছে সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং কুরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করতে হবে। অবশ্যই প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাসী। ধর্মনিরপেক্ষতার মানেই হচ্ছে নাস্তিকতা। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ নাগরিকই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং সঙ্গত কারণেই এই দেশকে মুসলিম দেশ বলতে হবে। আর ইসলামি আইনে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের স্ব-স্ব ধর্মীয় রীতি পালন ও নিরাপত্তা বিধানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সুতরাং আমরা মনে করি, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে মূলত এই দেশকে ধর্মহীন তথা নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার স্পষ্ট আলামত ইতোমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি।

প্রশ্ন : চলমান আন্দোলনের এবং হেফাজতে ইসলামের সর্বশেষ লক্ষ্য কী?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : চলমান আন্দোলনে আমরা ১৩টি দাবি উত্থাপন করেছি। ইসলাম ও মুসলিম জীবনধারা নিরাপদ রাখা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করাই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। ঈমান-আকিদা ও ইসলামবিরোধী কোনো তৎপরতা বা প্রতিকূলতা দেখা না দিলে মুসলমানদের মধ্যে সঠিক ইসলামি বিধিবিধান ও শান্তিশৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণের প্রচার এবং শিরক, বিদআতসহ সব ধর্মীয় কুসংস্কার সম্পর্কে মুসলমানদের সতর্ক করার মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকবে।

প্রশ্ন : ৬ এপ্রিল লংমার্চে কত লোক জমায়েতের সম্ভাবনা?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ প্রস্তুতি কমিটি ও সমন্বয় প্রতিনিধিদল বর্তমানে দেশব্যাপী সফর এবং জেলা কমিটির সাথে বৈঠক শেষ করছেন। মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষার জন্য অপরিহার্য দাবি ছাড়াও দেশের শান্তিশৃঙ্খলা, সম্প্রীতি ও নৈতিকতা রক্ষার জন্য হেফাজতে ইসলাম যে ডাক দিয়েছে, তাতে যে সাড়া মিলছে, আমরা স্পষ্ট আশাবাদী, সরকার কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করলে লংমার্চে অন্তত ৫০ লাখ লোকের জমায়েত হবে, ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন : এ কর্মসূচি বানচাল হলে কিংবা এতে বাধা দেয়া হলে?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : আমরা আগে থেকেই সতর্ক করে আসছি, ঈমান-আকিদা রক্ষায় আমাদের অরাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ লংমার্চে বাধা দেয়া হলে আমরা সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লাগাতার হরতাল বা অবস্থান ধর্মঘটের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো। তবে আমরা এখনো আশাবাদী, সরকার লংমার্চ কর্মসূচি পালনের আগেই আমাদের ন্যায্য দাবি পূরণ করে ওলামা-মাশায়েখ এবং ৯০ শতাংশ মুসলমানের বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

প্রশ্ন : জামায়াতের সাথে হেফাজতে ইসলামের সম্পর্কের  ব্যাপারেও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে । এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : হেফাজতে ইসলাম মূলত, দ্বীনি ও ইসলাহী কাজে নিয়োজিত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে হেফাজতে ইসলাম এ পর্যন্ত কখনো কোনো রাজনৈতিক বা কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে যায়, এমন কোনো দাবি বা কর্মসূচি দেয়নি। ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারী নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে আমাদের চলমান আন্দোলনেও আমরা যে ১৩টি দাবি উপস্থাপন করেছি, তার মধ্যে রাজনৈতিক দলসংশ্লিষ্ট কোনো দাবির অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না। আমাদের দাবি ও প্রতিবাদ কর্মসূচি একান্তই ঈমান-আকিদা, ইসলাম ও নৈতিকতা সংশ্লিষ্ট।

হেফাজতে ইসলামের নায্য দাবিতে যখন সারা দেশ উত্তাল, তখন ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক ব্লগার ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা তাদের অন্যায় অবস্থানের স্বপক্ষে কোনো যুক্তি খুঁজে না পেয়ে হেফাজতে ইসলাম ও আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও জঙ্গিবাদের কল্পনাটক সাজিয়ে বিষোদগারমূলক বক্তব্য রাখছেন। অথচ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও দেশী-বিদেশী পরিদর্শনকারীসহ দেশের কোটি কোটি তৌহিদি জনতা দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসা এবং হেফাজতে ইসলামের রাজনীতিমুক্ত শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও দাবি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিনই আমাদের সাথে দেখা করছেন, আমাদের পড়ালেখার পরিবেশ, শৃঙ্খলা, শান্তিপূর্ণ অবস্থান এবং হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তারা সবাই আমাদের অরাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ নীতির প্রশংসা করছেন। সুতরাং বিষয়টা এভাবে ভাবুন, যারা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ ও আল্লাহ্র রাসূলের অবাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে পারছে, তারা তাদের অপতৎপরতার প্রতিবন্ধক প্রতিবাদী ওলামা-মাশায়েখ ও হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিষোদগার বা অপপ্রচারে লিপ্ত হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। আমি মনে করি, তাদের অপতৎপরতা ঢাকার জন্য যত মিথ্যাচার ও অপপ্রচারই তারা করুক, দেশের ইসলামপ্রিয় জনতা এতে মোটেও বিভ্রান্ত হবেন না। সাধারণ মানুষ এটা সহজেই উপলব্ধি করতে পারছেন। আমি আপনাদের মাধ্যমে সমালোচনাকারীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, তারা প্রমাণ করে দেখাক, হেফাজতে ইসলাম ও ওলামা-মাশায়েখের কোনো দাবির সাথে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

বিভিন্ন মিডিয়া, টিভি টকশোতে হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার কথা যা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। জামায়াত থেকে আমরা অর্থ নিচ্ছি বলে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের উদ্দেশে বলব, টাকা-পয়সা নিলে জামায়াত থেকে কেন, মতাসীন বা ইসলামবিদ্বেষী মহল থেকেও তো নিতে পারতাম। আমরা ইসলামবিরোধী আগ্রাসন রোধ করার ল্েয আল্লাহর উপর ভরসা করে ময়দানে নেমেছি। দল-মত নির্বিশেষে সব মুসলমান আমাদের সমর্থন করছেন। ইনশাআল্লাহ ইসলাম ও মুসলিম জীবনধারা নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।

প্রশ্ন : আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সাথেও আপনার সখ্যতার কথা শোনা যায়। এ বিষয়ে বলবেন?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : যদি সত্যি সত্যিই এমন কিছু শুনে থাকেন, তবে সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। মুসলমান; এই পরিচয়ে লক্ষ কোটি মানুষের সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা বা সমর্থকের পরিচয়ে কারো সাথে সখ্যতা বা সংশ্লিষ্টতার কথা কেউ বলতে পারবে না। আমার পুরো জীবনটাই কেটেছে কুরআন-হাদিস ও ইসলামি শিক্ষার প্রচার-প্রসার, ঈমান-আকিদা রক্ষা, শিরক-বিদআত এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম হাটহাজারী পরিদর্শন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রায়ই সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, প্রতিনিধি দল ও বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব এসে থাকেন, অনেকে ব্যক্তি জীবনে সঠিক ইসলামি অনুশাসন পালনে দিকনির্দেশনা লাভ অথবা দোয়া নেয়ার জন্য আসেন। আমাদের অরাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সবাই অবগত।

প্রশ্ন : ব্লগারদের শাস্তি হলে হেফাজতে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যাবে না সক্রিয় থাকবে?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : আমি আগেও  উল্লেখ করেছি, মুসলমানদের ঈমান-আকিদা ও কৃষ্টি-কালচারের হেফাজত এবং এর বিরুদ্ধে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মোকাবেলায় ওলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদি জনতার সম্মিলিত কর্মপন্থা নির্ধারণ ও পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যেই ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপের জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। ইতঃপূর্বেও ধর্মহীন শিক্ষানীতি, হিজাব পালনে নারীদের বাধ্য করা যাবে না বলে হাইকোর্টের রায়, ফতোয়াবিরোধী হাইকোর্টের রায়, রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি প্রতিষ্ঠা, সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি তুলে দেয়া, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিল্লাহ বাদ দেয়ার চেষ্টা, ঢালাওভাবে আলেম-ওলামা ও কওমি মাদরাসার সাথে জঙ্গিবাদের সংশ্লিষ্টতা অপপ্রচার, ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধের চেষ্টা, দাড়ি-টুপিধারীদের নিগ্রহ, হাইকোর্টে কুরআন সংশোধনের জন্য মামলা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ, রাসূল, কুরআন ও ইসলাম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য এবং বিবৃতির বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও সম্মিলিত প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি সফল হয়েছি, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো সফলতা না পেলেও বাধাগ্রস্ত করতে পেরেছি। সবচেয়ে বড় যেই অর্জন সেটা হচ্ছে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে আমরা জোরালো এই বার্তা পৌঁছাতে পেরেছি, দেশের ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামপন্থীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ছোটখাটো মতভেদ থাকলেও ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস ও কৃষ্টি-কালচারের ওপর কোনো আঘাত এলে, সেক্ষেত্রে আমরা দ্রুত সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পড়ি। আমাদের অরাজনৈতিক কর্মসূচির পক্ষে দল-মত নির্বিশেষে বিশাল জনগোষ্ঠীর জোরালো সমর্থন রয়েছে। সুতরাং যখনই ইসলাম ও মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাস ও কৃষ্টি-কালচারের ওপর আঘাত আসবে, তখনই হেফাজতে ইসলাম তৎপর ভূমিকা রাখবে। আমি জোরালো আশাবাদী, হেফাজতে ইসলামের অরাজনৈতিক এই আন্দোলন দেশের ওলামা-মাশায়েখ স্থায়ীভাবে অব্যাহত রাখবেন।

প্রশ্ন : ভবিষ্যতে দেশের কোনো রাজনৈতিক সঙ্কটে হেফাজতে ইসলাম ভূমিকা রাখবে?

আল্লামা শাহ আহমদ শফী : হেফাজতে ইসলাম তার মৌলিক অরাজনৈতিক নীতিমালা তথা ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির বাইরে কোনো রাজনৈতিক ভূমিকায় জড়াবে না।

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers