এখন পড়ছেন
সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ কিছু ঘটনা : রেডিও তেহরানকে পিয়াস করিম

Pias Karimবাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে যেগুলোকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। যেমন- বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দেড় শতাধিক নেতাকে গ্রেফতার, মাওলানা সাঈদীর রায় পরবর্তী সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি, শাহবাগের সমাবেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, মিডিয়ার ভূমিকা ইত্যাদি। এসব বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলেছি-ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. পিয়াস করিমের সঙ্গে।তাঁর সাক্ষাতকারের প্রথম অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো :

রেডিও তেহরান :  অধ্যাপক পিয়াস করিম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বসাম্প্রতিক যে বড় ঘটনাটি ঘটেছে তা হলো- প্রধান বিরোধীদলের প্রথম সারির প্রায় সব নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফও বলেছেন-এটা ঠিক হয়নি। একে অনেকেই নজিরবিহীন ঘটনা এবং রাজনৈতিক কালচারের পরিবর্তন বলে উল্লেখ করেছেন। আপনি কি বলবেন?

অধ্যাপক পিয়াস করিম : দেখুন! দেশের বিরোধী দলের অফিসে সরকারি বাহিনীর বা পুলিশ বাহিনীর যে হামলা তাকে নিন্দা তো করতেই হবে। এর নিন্দা জানানোর কোন ভাষা নেই। আজকে আমরা বাংলাদেশে প্রচণ্ড একটা বিভক্ত সমাজে বাস করছি। আর এই বিভক্তি জাতিকে প্রচণ্ডভাবে মেরুকরণ করেছে এবং এর একটা অভিঘাত আমরা দেখেতে পাচ্ছি আমাদের অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক পরিস্থিতির ওপর।

যেখানে সরকারের উচিত ছিল এই বিভক্তির হাত থেকে জাতিকে বের করে নিয়ে আসার প্রয়াস পাওয়া তার বদলে সরকার একটা যুদ্ধংদেহী অবস্থা তৈরি করলেন বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে। বিএনপির অফিসে ঢুকে দলটির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে, তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে সরকার তাদেরকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ার একটা ব্যবস্থা করলেন। এটা কেন করলেন পলিটিক্যাল রেশনালিটির দিক থেকে দেখতে গেলে তার কোন যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ সরকারের তো এটা বুঝা উচিত যে, বেশি না হলেও অন্তত অর্ধেক জনগোষ্ঠী বিএনপির পক্ষে অন্যদিকে বাকি অর্ধেক সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষে। ফলে দেশের অন্তত অর্ধেক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে যে রাজনৈতিক দলটি তাকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সরকার কি অর্জন করতে চায় সেটা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। আর এই যুদ্ধে হয়ত সরকার জিতবে না। যারা বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা বোঝেন, যারা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতাটা জানেন তারা এটা ভালভাবেই বুঝতে পারবেন যে, বিএনপির ওপর দমন-পীড়ন ও নির্যাতন চালিয়ে দল হিসেবে দমিয়ে রাখা যাবে না। বরং এ রকম দমন নিপীড়নের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর এই বিষয়টি সরকার কেন বুঝতে পারলেন না এটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

রেডিও তেহরান : আমরা সমসাময়িক আরেকটি ঘটনা নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। তা হলো- সম্প্রতি পুলিশ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহিংসতায় বিশেষ করে পুলিশের গুলিতে শতাধিক প্রাণ হারিয়ে গেছে বাংলাদেশে। একেও অনেকে নজিরবিহীন ঘটনা বলছেন। তাদের অভিযোগ- পাকিস্তানি শাসকদের হাতে এত বেশি মানুষ একদিনে তো নয়ই বরং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলেও হয়নি। এ অভিযোগকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

অধ্যাপক পিয়াস:  আমি ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত রকমের রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে। আমি যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে। আর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনেক বেশি সহিংস হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আজকে জামায়াতে ইসলামী বলি, আওয়ামী লীগ বলি বা বিএনপি বলি- দল হিসেবে তারা যতটা সহিংস হওয়ার ক্ষমতা রাখে রাষ্ট্রযন্ত্র তার চেয়ে অনেকে বেশি ক্ষমতা রাখে। আর সেই রাষ্ট্রের পুলিশ যখন অসংযত ব্যবহার করে, যখন কোন রকম বিধি-নিষেধ না মেনে জনগণের ওপর গুলি করে তখন সেটা খুবই দুঃখজনক। ধরা যাক- জামায়াতের মিছিল থেকে যদি আইন লংঘন করা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে পুলিশের সামনে কতগুলো পথ খোলা ছিল। পুলিশ প্রথমে তাদের সতর্ক করতে পারত, এরপর পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস প্রয়োগ করতে পারত তারপর একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে   গুলির নির্দেশ দেয়া যেত। কিন্তু পুলিশ তা না করে প্রথমেই পাখির মতো গুলি করা এটাকে তো কোন রাজনৈতিক বিধিমালায় বা কোন গণতান্ত্রিক নিয়ম নীতি অনুসারে এটাকে জাস্টিফাই করা যাবে না। এটা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। সরকার চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালু করে একটি প্রতিবাদ করতে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ ন্যায় নাকি অন্যায় সে বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। তবে তারা একটি প্রতিবাদকে দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। এটা কিন্তু কাউন্টার প্রডাকটিভ হতে পারত। কিন্তু এভাবে তো আসলে হয় না। পৃথিবীর কোন দেশেই ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্যাতন চালিয়ে স্তব্ধ করা যায়নি আজ পর্যন্ত। আমি Karen Armstrong-এর The Battle for God যখন পড়ছিলাম তখন দেখলাম পৃথিবীর কোন জায়গায় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে ওরকভাবে দমন করা যায়নি। বরং দমন করার যত চেষ্টা করা হয়েছে ততই তারা আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ফলে সরকারের সহিংসতাকে আমি নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিরোধীতা করি। তাছাড়া বাস্তব রণকৌশলগত দিকে থেকেও সরকার প্রচণ্ড রকমের একটা ভুল করছে বলে আমার ধারনা। কারণ জামায়াতের আন্দোলনে ও প্রতিবাদে পুলিশের বাধা দেয়ার ফলে বা পুলিশির আচরণের কারণে তাদের Political Resolve-কে আরো বেশি দৃঢ় করেছে।

রেডিও তেহরান : দেশে সাম্প্রতিক বেশ কিছু কর্মকাণ্ডে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তারা বলছেন, নজিরবিহীনভাবে দেউলিয়াত্ব তুলে ধরেছে বেশিরভাগ গণমাধ্যম। তো মিডিয়ার বিরুদ্ধে এ অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? এ থেকে বের হয়ে আসার উপায় কি?

অধ্যাপক পিয়াস :   বাংলাদেশের মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো- আমি প্রিন্ট মিডিয়ার কথাই বলি বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কথাই বলি- তারা আমাদেরকে হতাশ করেছে। একেবারেই শাহবাগের আন্দোলনের একটা Uncritical Endorsement দিয়েছে মূল ধারার পত্রিকাগুলো এবং মূল ধারার চ্যানেলগুলো। গত কয়েক সপ্তাহ তো মনে হয়েছে বাংলাদেশে আর কোন খবর নেই, বাংলাদেশে আর কিছু ঘটছে না। শাহবাগ সমস্ত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে শাহবাগ আসলে যা না তারচেয়ে বেশি করে প্রজেক্ট করা হয়েছে। ফলে সমস্ত বিবেচনায় শাহবাগ হচ্ছে- Media Construct. মিডিয়া শাহবাগকে নির্মাণ করেছে। শাহবাগের গণজাগরণ বলি, মঞ্চ বলি বা যে নামেই ডাকি না কেন শাহবাগ যতোট না মিডিয়া তার চেয়ে বেশি করে প্রজেক্ট করেছে। তবে সব মিডিয়া যে একাজটি করেছে তা নয়। যে কয়েকটি মিডিয়া তার বিরুদ্ধে সরাসরিভাবে দাঁড়িয়েছে তাদেরকে বয়কট করার আহবান জানানো হয়েছে, তাদেরকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছে। আর দু’একটি পত্রিকার নামধরে আমি বলছি- যেমন ‘নিউ এজ’ এরা মাঝামাঝি একটা অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে। ফলে মিডিয়াগুলোর বিভিন্ন দিক ফুটে উঠেছে। আর এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে শাহবাগের গণজাগরণ নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের যে ভূমিকা সেটা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পক্ষে যায়নি।

intrvwরেডিও তেহরান : জনাব পিয়াস করিম, আরেকটি ঘটনা আপনার সামনে তুলে ধরতে চাই তাহলো- শাহবাগের সমাবেশকে অনেকে নজিরবিহীন বলছেন। এই নজিরবিহীন বলার পেছনে তাদের যুক্তি হলো- দেশে এর আগে কখনো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের জনগুরুত্বসম্পন্ন একটি স্থানে এত দীর্ঘদিন ধরে কোনো দল বা সংগঠন সমাবেশ করেনি। অবশ্য, সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তো আপনি কি একে নজিরবিহীন বলবেন? আর শাহবাগের সমাবেশের মূল গুরুত্বটা কোথায়?

অধ্যাপক পিয়াস: শাহবাগের মূল কতোগুলো Political এবং Legal Premise-এর ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে তবে ওই বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন- শাহবাগের আন্দোলনকে আমি নজিরবিহীন  বলব কি-না। আপনি যদি সম্ভবত ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের আন্দোলনের দিকে নজর বুলান তাহলে দেখা যাবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নির্যাতনের মুখে তা বন্ধ হয়েছিল। সম্প্রতি মিশরের কায়রোর ‘তাহরির স্কয়ারের কথা বলেন-সেটা একটা রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে এই অর্থে যে, সেখানকার ক্ষমতা থেকে হোসনি মুবারেককে উতখাত করা গেছে। আর এই দুটো আন্দোলনই ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণসহ সাধারণ জনগণের বিদ্রোহের  প্রতীক। কিন্তু তিয়েনআনমেন স্কয়ারে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণরা বিদ্রোহ করেছিল তবে তারা অন্ততপক্ষে সাময়িকভাবে পরাজিত হয়েছিল তবে ভবিষ্যতে কি হবে তা আমরা জানি না। অন্যদিকে তাহরির স্কয়ারে জনসাধারণ রুখে দাঁড়িয়েছিল তারা জয়লাভ করেছে। কিন্তু এসব আন্দোলনের কোনটিতে সরকারের পৃষ্টপোষকতা ছিল না। শাহবাগে তিন স্তরের পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে থেকে, খাবার, বাথরুম, ওয়াইফাই থেকে শুরু করে সরকারি সবধরনের সুবিধা নিয়ে একটা আন্দোলন তো আর গণআন্দোলন হতে পারে না। ফলে শাহবাগের ব্যাপারে জনসাধারণের যে উদ্দীপনা ছিল অন্তত পক্ষে ঢাকার মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজের মধ্যে সেটা উবে যেতে  শুরু করল। মানুষ শাহবাগের আন্দোলনের ব্যাপারে বিরক্ত হতে শুরু করল কারণ ট্রাফিক বন্ধ করে পাশের দুটো বড় হাসপাতালের রোগীদের সুযোগ সুবিধার কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় এ ধরনের আন্দোলনের প্রতি মধ্যবিত্তরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আজকে শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ডিসকানেক্ট তৈরি হয়েছে।। যারা শাহবাগের বাবলের মধ্যে বসে আছেন তারা কিন্তু  বুঝতে পারছেন না আসলে শাহবাগের সাথে জনমানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। আর শাহবাগীরা যদি এটা না বোঝে তাহলে তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ফলে আমি এটাকে নজিরবিহীন এই অর্থে বলছি যে-রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ও পৃষ্টপোষকতায় একটা গণআন্দোলনের ফানুস দাঁড় করান হল। কিন্তু ‘শাহবাগ মঞ্চ’ তিয়েনআনমান স্কয়ার নয় বা তাহরির স্কয়ারও নয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের উদ্যোগে, জনগণের উদ্দীপনার ওপর দাঁড়িয়ে একটি আন্দোলন তৈরি করার বাসনা প্রথম দিক থেকেই ছিল না এবং এটা হয়নি। তবে প্রথম দিকে শাহবাগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অনেক তরুণদের মধ্যে আন্দোলনের উদ্দীপনা ছিল কিন্তু তা পরবর্তীতে শাহবাগ আন্দোলন আর সেই তরুণদের হাতে থাকেনি। এটাকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। এটাকে দলীয়করণ করা হয়েছে।

Advertisements

আলোচনা

কোন মন্তব্য নেই এখনও

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

হেফাজতে ইসলামের খবর

https://banglargangai.wordpress.com/wp-admin/widgets.php#available-widgets

ফরহাদ মজহারের কলাম

Join 253 other followers